মায়াকাননের মাইকেল

7

১৮৫৮ সালের মার্চ মাস।

কলকাতার জয়রাম বসাকের বাড়িতে ইতিহাসে এই প্রথম বাংলা নাটক অভিনীত হতে যাচ্ছে।

নাটকটির নাম ‘কুলীনকুল সর্বস্ব’। নাটকটির লেখক রামনারায়ণ তর্করত্ন। আর অন্যদিকে আশুতোষ দেবের বাড়িতে অভিনীত হল ‘শকুন্তলা’ নাটক। এখানে একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন, বাংলা নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার আগে বাংলাভাষায় যাত্রাপালা থাকলেও নাটক বলে কিছু ছিল না। কিন্তু কলকাতায় ইংরেজরা একাধিক থিয়েটার স্থাপন করেছিল। সেখানে অভিনীত হতো ইংরেজি নাটক। আঠারশ’ শতকের মাঝামাঝি কলকাতার ধনপতিদের মধ্যে হুড়াহুড়ি পড়ে গেল কার চেয়ে কে ভালো নাটক তৈরি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে খ্যাতি অর্জন করবে। বাংলা নাটক আয়োজনে সেই সময়ের অগ্রগণ্য ব্যক্তিরা হলেন- কালীপ্রসন্ন সিংহ, প্রতাপ ও ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ, যতীন্দ্র মোহন ঠাকুর প্রমুখ। ঠিক ওই সময় মাইকেল মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় ফিরেছেন। মাইকেল গবেষক গোলাম মুরশিদ রচিত ‘আশার ছলনে ভুলি’ গ্রন্থ থেকে জানতে পারি, মাইকেল মাদ্রাজে তার স্ত্রী রেবেকা ও চার সন্তানকে ফেলে মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় চলে আসেন। বড় মেয়ে বার্থার বয়স তখন সাড়ে ছয়, ফীবির পাঁচ, জর্জের সাড়ে তিন ও জেমসের এক বছরেরও কম।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কি কখনও মাদ্রাজ ফিরে গিয়েছিলেন তার স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাদের কাছে? এর উত্তর হচ্ছে- না। তিনি আর কোনো দিন স্ত্রী কিংবা পুত্র-কন্যাদের কাছে ফিরে যাননি। জীবনে তাদের সঙ্গে আর দেখাও হয়নি এবং ইতিহাস থেকেও এটি নিশ্চিত জানা যায়নি তাদের ভাগ্যে সত্যিই কী ঘটেছিল? মাইকেল মধুসূদন দত্ত সেসব নাটক দেখে নাক কুঁচকালেন এবং বললেন এগুলো কোনো নাটক হল! কলকাতার জমিদার-রাজারা বাজে নাটক মঞ্চস্থ করে অর্থ ব্যয় করছে বরং তাকে বললে তিনি একটি ভালো নাটক লিখে দিতে পারেন। তার এ কথায় তার ছোটবেলার বন্ধু গৌরদাস বসাক হেসেছিলেন। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সুরে হাসলেন রাজা-জমিদাররাও। কারণ মধুসূদনের নাটক লেখার কোনো অভ্যাস নেই। তিনি কীভাবে লিখবেন সর্বোৎকৃষ্ট নাটক? যাই হোক, মাইকেল মধুসূদন নাটক লেখার এ বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলেন। তিনি লিখতে শুরু করলেন। নাটকের কাহিনীটি তিনি ধার করলেন মহাভারত থেকে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে তিনি বন্ধু গৌরদাসকে নাটকের কয়েকটি দৃশ্য পড়ে শোনালেন। যে গৌরদাসের মধুসূদনের বাংলা সম্পর্কে সন্দেহ ছিল সেই গৌরদাসই নাটকটির কিছু অংশ পড়ে অভিভূত হয়ে বললেন, নাটকটি তো বেশ চমৎকার হয়েছে। মাইকেল মধুসূদনের কিন্তু তখনও সন্দেহ ছিল তার নিজের বাংলা নিয়ে। তিনি নাটকের সংলাপগুলো লিখেছিলেন যতদূর সম্ভব সহজ করে, সমসাময়িক কলকাতার মানুষের মুখের কথ্য ও সহজ ভাষায়। মাত্র তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে তিনি নাটকটি দাঁড় করিয়ে ফেললেন এবং নাটকের নাম দিলেন ‘শর্মিষ্ঠা’। এ নাটকটি তিনি মনপ্রাণ ঢেলে লিখেছিলেন। এর পেছনের কারণ হল, এ কাহিনীর সঙ্গে মধুসূদনের নিজের জীবনের আশ্চর্য মিল পাওয়া যায়। তিনিও প্রথমে রেবেকাকে বিয়ে করে পরে গোপনে আবার হেনরিয়েটার প্রেমে পড়েছিলেন। তবে শর্মিষ্ঠা নাটকে দুই সখী যেমন শর্মিষ্ঠা ও দেবযানীর মিল হলেও বাস্তবে রেবেকার সঙ্গে হেনরিয়েটার কখনও মিল হয়নি। রাজা যযাতির মতো মাইকেলও এ দু’জনকে নিয়ে একসঙ্গে সুখে জীবন কাটাতে পারেননি।

তিনি তার এ শর্মিষ্ঠা নাটকটি ওই সময়ের কলকাতার আরও অন্যান্য বিজ্ঞজনদের দেখালেন। তারা সবাই একবাক্যে স্বীকার করলেন, সত্যিই এমন নাটক বাংলায় এর আগে লেখা হয়নি। এখানে অনেকের মনে এ প্রশ্নটি উঁকি দিতে পারে, যেখানে মাইকেল নিজেই তার বাংলা নিয়ে সন্দিহান সেখানে কী করে তিনি এত সফল ও সার্থক নাটক লিখলেন। এর উত্তর সম্ভবত মাইকেল মধুসূদন ইংরেজি নাটক খুব ভালো করে পড়েছিলেন।

তা ছাড়া মিল্টনের ‘প্যারাডাইজ লস্ট’ মহাকাব্য কিংবা বায়রনের ‘ডন জুয়ান’ কাব্য ছিল মাইকেল মধুসূদন দত্তের মুখস্থের পর্যায়ে। নিঃসন্দেহে এ কথা বলা যায়, শর্মিষ্ঠা নাটকটি লিখতে গিয়ে তিনি তার সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। উপরন্তু তিনি যখন মাদ্রাজে ছিলেন তখন ‘রিজিয়া’ নামে একটি নাটক লিখেছিলেন। ওই নাটকটি তিনি শেষ করেছিলেন এবং সেটি লিখতে গিয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।

মাইকেল মধুসূদন যে শুধু বাংলায় সার্থক নাটক লিখেছিলেন- তা কিন্তু নয়। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহাকাব্যেরও রচয়িতা, যাকে বলে এক কথায় মহাকবি। তিনি বাংলায় প্রথম সনেট লেখেন এবং এ পর্যন্ত তিনি বাংলায় সনেটের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। তিনি বাংলায় সবার আগে এবং সবচেয়ে প্রসিদ্ধ পত্রকাব্য ‘বীরাঙ্গনা’ রচনা করেন। তিনি বাংলাভাষায় সবার আগে অমিত্রাক্ষর ছন্দের সূচনা করেন। প্রবহমান প্রথম পয়ার ছন্দও তিনি বাংলায় প্রথম চালু করেছিলেন।

এই বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন জাতিস্মর সাহিত্যিকের জন্ম হয়েছিল ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু কায়স্থ পরিবারে। তিনি ছিলেন রাজনারায়ণ দত্ত ও তার প্রথম স্ত্রী জাহ্নবী দেবীর একমাত্র সন্তান। মধুসূদনের ঠাকুরদা ছিলেন গরিব সাধারন মানুষ। সামান্য লেখাপড়া জানতেন। এমন পরিবারের ছেলে হয়ে মধুসূদন কীভাবে এতবড় কবি হলেন সেটি সবাইকে ভাবিয়ে তোলে। তার চেয়েও অবাক করার বিষয় হল- সমাজে সবাই টাকা-পয়সা আয়-রোজগার করে অর্থশালী বা বিত্তশালী হতে চায় কিন্তু মাইকেল মধুসূদন হতে চাইলেন কবি। হতে চাইলেন একজন আধুনিক মানুষ। মননে তো অবশ্যই, পোশাক ও আচার-আচরণেও। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ নামক বিখ্যাত উপন্যাসটিতে দেখতে পাই লেখক কীভাবে মাইকেল মধুসূদনের সেই পোশাকি চরিত্রটিকে এঁকেছেন ‘মধুর গায়ে ইংরেজি কোট। দারুণ গ্রীষ্মেও সে এই কোট খোলে না। কিছুদিন আগে বুট-পায়জামা ও আচকান ছেড়ে হঠাৎ সে এই কোট ধরেছে, তারপর থেকেই তার সুরা পানের মাত্রাও বেড়েছে।’

১৮৩০ সালের দিকে মাইকেল মধুসূদনের বাবা রাজনারায়ণ দত্ত কলকাতার একজন খ্যাতনামা শীর্ষস্থানীয় উকিল হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। বাঙালিদের মধ্যে কলকাতায় তার সমকক্ষ শুধু একজন উকিলই ছিলেন যার নাম- বিধুশেখর। রাজনারায়ণ দত্তের বড় তিন ভাই ছিলেন। সবার বড় ভাইয়ের নাম রাধামোহন। তিনি সাগরদাঁড়ি ছেড়ে যশোর শহরে থিতু হন এবং আদালতে সেরেস্তাদারের চাকরি জুটিয়ে নেন। তিনি নিজে উন্নতি করেছিলেন ফার্সি ভাষা জানতেন বলে। কারণ তখন অফিস-আদালতের ভাষা ছিল ফার্সি।

তিন ভাইকেই রাধামোহন লেখাপড়া শেখান। বিশেষ করে ফার্সি ভাষা। মেজ ভাই মুন্সেফ অর্থাৎ বিচারক হন। আর রাজনারায়ণ দত্ত ও অন্য আরেক ভাই হন উকিল। রাজনারায়ণ দত্ত খুব ভালো ফার্সি জানতেন বলে তিনি তার ভাগ্য বদলাতে চলে এলেন কলকাতায় এবং তিনি সম্ভবত ১৮২৯ সাল থেকে সেখানেই ওকালতি শুরু করেন। কলকাতা তখন ছিল ভারতবর্ষের রাজধানী।

ওই সময়ও কলকাতায় প্রচুর লোকের সমাগম ছিল, সে জন্য মামলা-মোকদ্দমাও ছিল প্রচুর। ওকালতি ব্যবসা রাজনারায়ণ দত্ত খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই জমিয়ে ফেললেন। অর্থপ্রাপ্তিও হতে লাগল অঢেল। সেই টাকা দিয়ে রাজনায়ারণ দত্ত কলকাতার দক্ষিণ শহরতলী ক্ষিদিরপুর সার্কুলার গার্ডেন রিচ রোডে (বর্তমানে কার্ল মার্কস সরণি) একটি বিশাল প্রাসাদতুল্য অট্টালিকা কেনেন।

তারপর ১৮৩৩ সালের দিকে তিনি যশোরের সাগরদাঁড়ি থেকে তার পরিবার অর্থাৎ স্ত্রী জাহ্নবী দেবী ও পুত্র মধুসূদনকে নিয়ে এলেন কলকাতায়। মধুসূদন তখন নয় বছরের বালক। তার প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় মা জাহ্নবী দেবীর কাছে। জাহ্নবী দেবী মোটামুটি ভালোই লেখাপড়া জানতেন। এই যে মধুসূদন কালে একজন মহাকবি হয়ে উঠেছিলেন। এর পেছনে ছিল তার মা জাহ্নবী দেবীর অসীম অবদান। কারণ ছোটবেলা থেকেই জাহ্নবী দেবী মধুকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রামায়ণ, মহাভারত ও অন্যান্য পৌরাণিক গল্পগাথা বেশ ভালোভাবেই সুপরিচিত ও আত্মস্থ করাতে পেরেছিলেন। মায়ের কাছ থেকে শুনে শুনেই মধু রামায়ণ ও মহাভারতের বেশ খানিকটা মুখস্থও করেছিলেন। তার চেয়েও বড় কথা, তিনি কবিতা ভালোবাসতে শেখেন। মায়ের কাছ থেকে তিনি আরও দুটি গুণ পেয়েছিলেন। একটি হচ্ছে- দয়ালুত্ব, অন্যটি মিষ্টি ব্যবহার। কলকাতায় আসার আগে মধুসূদন সাগরদাঁড়ির পাশের গ্রাম শেকপুরা মসজিদের ইমাম মুফতি লুৎফুল হকের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছিলেন। বিদ্বান ইমামের কাছে তিনি বাংলা, ফার্সি ও আরবি শিখেছিলেন। ন’বছর বয়সে মধুসূদন সাগরদাঁড়ি থেকে কলকাতায় এলেন।

কলকাতা নগরী দেখেও বিস্মিত হয়েছিলেন মধুসূদন। সুন্দর সুরম্য রাস্তাঘাট, প্রাসাদ অট্টালিকা, নানা রকম ঘোড়ার জুড়ি গাড়ি কিংবা ছ্যাকরা গাড়ি। তখনও অবশ্য মোটরগাড়ি আবিষ্কার হয়নি। হাজার হাজার মানুষজন ছুটে চলেছে রাস্তা ধরে। এখানে উল্লেখ্য, কলকাতা শহরের গোড়াপত্তন করেছিলেন ইংরেজ জব চার্নক ১৬৯৩ সালে তিনটি গ্রাম নিয়ে। এর মধ্যে একটি গ্রামের নাম ছিল কলকাতা।

ইংরেজরা কলকাতা শহর প্রতিষ্ঠা করায় প্রচুর সংখ্যক ইংরেজ সাহেবেও ভর্তি ছিল এ শহর। একটি স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করান হল মধুকে। কিন্তু সেই স্কুলে তার অনেক অসুবিধা হতে লাগল। তিনি কথা বলতেন যশোরের আঞ্চলিক ভাষায়। কলকাতায় তার স্কুলের অন্য ছেলেরা কথা বলত কলকাতার শুদ্ধ বাংলায়। মধুসূদন গ্রাম্য ভাষায় কথা বলতেন বলে অন্য বন্ধুরা তাকে বাঙ্গাল বলে ব্যঙ্গ করত। কলকাতার স্কুলের আরেকটি বিষয় বেশ অবাক লাগল মধুসূদনের তা হল- এখানে ইংরেজি, গ্রিক আর ল্যাটিন পড়ানো হয়। কলকাতায় আসার আগে মধুর সেই গ্রামের স্কুলে গ্রিক কিংবা ল্যাটিন তো দূরের কথা ইংরেজি পর্যন্ত পড়ানো হতো না। কিন্তু মধুসূদন ইংরেজি ভাষা শিখেছিলেন খুব ভালো করে।

তার সময়ে অন্য কোনো বাঙালি তার মতো এত চমৎকার ইংরেজি জানতেন কিনা- তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। মধুসূদন কী পরিমাণ ইংরেজি জানতেন সেটি আমরা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচিত ‘সেই সময়’ উপন্যাস থেকে এর একটি চিত্র পেতে পারি। কলকাতার বিখ্যাত পত্রিকা ‘বেঙ্গল স্পেক্টেটর, ক্যালকাটা লিটেরারি গেজেট, কমেট প্রভৃতি কাগজে রাজনারায়ণ দত্তের ১৭-১৮ বছরের ছেলের ইংরেজি পদ্য ছাপা হচ্ছে। সে জন্য রাজনারায়ণ দত্তের গর্বের অন্ত নেই।

আদালতে তার সহকর্মী বিধুশেখর একদিন রাজনারায়ণ দত্তকে বললেন, তোমার ছেলে যা ইংরেজি শিখেছে দু’দিন বাদে তো সাহেবদের মাথায় হাগবে! এ কথা শুনে পরম পরিতৃপ্তি পেয়েছিলেন রাজনারায়ণ দত্ত।’ মধুসূদন যে সময়ে কলকাতায় এসেছিলেন সেই সময়ের কলকাতা ছিল এক পঙ্কিল সামাজিক পরিবেশে নিমজ্জিত। কৌলীন্য প্রথা, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, জাতিভেদ, কুৎসিত আচার-বিচার, সতীদাহ প্রথাটি অবশ্য বড়লাট লর্ড বেন্টিংক ১৮২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর আইন করে রদ করেছিলেন। ইংরেজরা দোর্দণ্ডপ্রতাপে অত্যাচার করেছে এ দেশের মানুষদের ওপর।

এসব অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে কলকাতা হিন্দু কলেজের শিক্ষক ইউরেশীয় কবি ও চিন্তাবিদ ডিরোজিও’র নেতৃত্বে শুরু হয়েছে নবযুগ। অর্থাৎ যাকে বলে রেনেসাঁ। বাংলায় রেনেসাঁ যুগটি হেনরি লুই ভিভিয়েন ডিরোজিওর নেতৃত্বেই শুরু হয়েছিল।

মধুসূদন ১৮৩৭ সালে তখনকার বিখ্যাত হিন্দু কলেজে (পরবর্তী সময় যার নাম হয় প্রেসিডেন্সি কলেজ) ভর্তি হলেন। এ হিন্দু কলেজেরই শিক্ষক ছিলেন ডিরোজিও। যদিও ডিরোজিও হিন্দু কলেজ ত্যাগ করেন ১৮৩১ সালে কিন্তু তারপরও ডিরোজিও হিন্দু কলেজের ছাত্রদের মধ্যে চিন্তায়, কর্মে ও আচরণে যে স্বাধীনতার বাণী স্ফুরিত করেছিলেন মধুসূদনও তার দ্বারা প্রবলভাবে সংক্রমিত হয়েছিলেন।

মধুসূদন ছাত্র হিসেবে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তাই তিনি অল্পদিনের মধ্যেই অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ডিএল রিচার্ডসনের প্রিয় ছাত্র হয়ে উঠলেন। রিচার্ডসনই মধুসূদনের মনে কাব্যপ্রীতি সঞ্চারিত করেছিলেন। মধুসূদন কবি হওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন।

তার ওপর আবার ইংরেজি ভাষার কবি। কীভাবে হওয়া যায় সে চিন্তাই সবসময় করতেন তিনি। তার সবচেয়ে প্রিয় কবি ছিলেন বায়রন। বায়রনের কাব্যগ্রন্থগুলো তিনি সবসময় মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়তেন। ঠিক এ সময়েই মধুসূদন ইংরেজি কবিতা লেখা শুরু করেন এবং সেগুলো ছাপা হতো কলকাতার প্রথম শ্রেণির পত্রিকাগুলোয়। মধুসূদন মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান হয়ে যাবেন।

আর তাহলেই হয়তো তিনি ইংরেজি ভাষার কবি হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। ১৮৪৩ সালে রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। এরপর ওই বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি ‘ওল্ড মিশন চার্চ’ নামে একটি অ্যাংলিকান চার্চে গিয়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। তাকে দীক্ষিত করেছিলেন পাদ্রী ডিল্ট্রি। তিনিই তাকে মাইকেল নামকরণ করেন। তারপর থেকেই তিনি পরিচিত হন মাইকেল মধুসূদন দত্ত নামে। মাইকেলের পিতা ছেলেকে বিধর্মী বলে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন।

খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পর মধুসূদন শিবপুরের বিশপ কলেজে লেখাপড়া শুরু করেন। বিশপ কলেজে কয়েকজন মাদ্রাজি ছাত্রের সঙ্গে কিছুদিনের মধ্যেই মধুসূদনের সখ্য গড়ে ওঠে। বিশপ কলেজে অধ্যয়ন শেষ করে যখন তিনি কলকাতায় চাকরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হন, তখন তার সেই মাদ্রাজি বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ্যান্বেষণে মাদ্রাজ চলে যান। মাদ্রাজে এসেই তিনি বিয়ে করেন খ্রিস্টান অ্যাংলো রমণী রেবেকা ম্যাকট্যাভিশকে। কিন্তু রেবেকার সঙ্গে তার দাম্পত্যজীবন সুখের হয়নি। তিনি সবার অজ্ঞাতে এক অধ্যাপকের কন্যা হেনরিয়েটার প্রেমে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

সেটি জানাজানি হলে তিনি গোপনে তার স্ত্রী রেবেকা ও পুত্র-কন্যাদের ছেড়ে মাদ্রাজ থেকে পালিয়ে কলকাতা চলে আসেন। তার কিছুদিন পর হেনরিয়েটাও মাদ্রাজ ছেড়ে মধুসূদনের উদ্দেশ্যে কলকাতায় পাড়ি জমান। এ সময় শুরু হয় প্রচণ্ড অর্থকষ্ট। স্বজাতি ও স্বধর্ম ত্যাগ করার কারণে পিতৃসম্পদ থেকে আগেই বঞ্চিত হয়েছিলেন। অথচ এ সময়টাই ছিল তার সাহিত্যজীবনের নবান্নের কাল।

সৃষ্টির উন্মাদনায় তিনি প্রবল বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার সাহিত্যাঙ্গন। এ সময় রচিত হয় তার অমর কাব্য ‘মেঘনাদবধ’। মধুসূদনের এ কালের রচনাগুলোর মধ্যে ছিল শর্মিষ্ঠা (১৮৫৮), একেই কি বলে সভ্যতা (১৯৫৯), বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ (১৯৫৯), পদ্মাবতী (১৮৬০), কৃষ্ণকুমারী (১৮৬০), তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য (১৮৬০), মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬০), ব্রজঙ্গনা (১৮৬০), বীরাঙ্গনা (১৮৬০), মায়াকানন (১৮৭০), হেক্টর বধ (১৮৭১) এবং চতুর্দশপদী কবিতাবলী।

অর্থকষ্ট লাঘবের জন্য তিনি উকিল হওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। কিন্তু ওই সময়ে কলকাতায় পরপর তিন বছর ধরে ওকালতিতে প্রবেশের জন্য কোনো পরীক্ষাই অনুষ্ঠিত হল না। বন্ধুরা তাকে পরামর্শ দিলেন বিলেত থেকে ব্যারিস্টার হয়ে আসার জন্য। বন্ধুদের পরামর্শে তিনি এত খুশি হলেন, বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে লিখলেন- ‘আরে ভাই, মধু আর শুধুমাত্র কবি নয়, এরপর আমার পরিচয় হবে মাইকেল এম এস ডাট, বার-এট-ল, ইনার টেম্পল। হাহ হাহ হাহ …’

এরপর ১৮৬৬ সালে মাইকেল মধুসূদন বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে এসে কলকাতা কোর্টে ওকালতি শুরু করলেন। এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতে হয়, তার আগে শুধু বাঙালি হিসেবে নন, পুরো এশিয়ার মধ্যে সর্বপ্রথম ব্যারিস্টার হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের দূরসম্পর্কীয় আত্মীয় জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুর, সেটি ছিল ১১ জুন, ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ। কিন্তু অতিরিক্ত মদপান ও বিলাসিতায় মাইকেলের আইন ব্যবসা খুব একটা জমেনি।

১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে মধুসূদন আইন ব্যবসা ছেড়ে শহরের জনৈক বড়লোকের আইন উপদেষ্টার কাজ নেন। কিন্তু এ কাজটাও তার ভালো লাগল না। ছেড়ে দিয়ে তিনি আবার শুরু করলেন আইন ব্যবসা। কিন্তু সেই যে জীবনের শুরু থেকে অস্থিরতা এটা ছেড়ে ওটা, ওটা ছেড়ে আরেকটায়- এমন করতে করতেই পার হয়ে যায় অনেক সময়। জীবনের মূল্যবান সময় কেটে যায় অস্থিরতার মধ্য দিয়েই। তাই শেষবারের মতো আবার যখন আইন ব্যবসা শুরু করলেন তখন তেমন সুবিধা করতে পারলেন না। অর্থসংকটে এ সময় তিনি প্রায় দিশাহারা হয়ে পড়েন।

ধীরে ধীরে তার বক্ষপিঞ্জরে বাসা বাঁধতে থাকে কালব্যাধি। রোগ ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। অতঃপর তাকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হতে হয় কলকাতার জেনারেল হাসপাতালে। এ সময় স্ত্রী হেনরিয়েটা নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুন প্রতিপ্রাণা হেনরিয়েটার প্রাণবিয়োগ ঘটে। স্ত্রীর মৃত্যু সংবাদ মধুসূদনের জীবন প্রদীপকে আরও ক্ষীণতর করে দিল। হেনরিয়েটার মৃত্যুর দু’দিন পর ২৯ জুন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মধুসূদন। এভাবেই বাংলার সাহিত্যাকাশের এক কালজয়ী স্রষ্টার বহু উত্থান-পতনের বৈচিত্র্যময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here