কাটি ধান

7

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তার সঙ্গীত জীবনের প্রথম দিকে আইপিটিতে (ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার) যুক্ত হয়েছিলেন। তার অনুজপ্রতীম বন্ধু সলিল চৌধুরী তখন আইপিটিতে।

দুজনই পরে বোম্বাইবাসী হয়েছিলেন এবং মুম্বাইয়ের সিনেমা শিল্পের সঙ্গে জড়িত হন। এরা দীর্ঘদিন বোম্বাইয়ে (এখন মুম্বাই) বাস করেন এবং শেষ জীবনে কলকাতায় ফিরে আসেন। আইপিটির অনেক গানের কথা ও সুর সলিল চৌধুরীর। হেমন্তের রেকর্ড করা কৃষকের গান আমরা ছোটবেলায় দলবেঁধে গাইতাম এবং নাচতামও। যেমন আমরা করতাম গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারী গান, সেটাও দলবেঁধে ঘুরে ঘুরে, ‘কাঠি সামালোরে ভাই, কাঠি সামালো’। দশ ঘরের এক উঠোন সেটি ছিল উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি, প্রশস্ত। সেখানেই এসব গীত ও নৃত্য তালে তালে চলত, মন্দ লয়ে দ্রুত লয়ে অনেকক্ষণ। এসব ছিল আমাদের বিনোদন, আমাদের সংস্কৃতি, বাল্য ও কৈশোরের।

আইপিটির হয়ে হেমন্ত শুধু ধানের গান পরিবেশন করেননি, জলের ও কামার-কুমোরের গানও গেয়েছিলেন। শ্রমজীবনের এমন গান পরে আর তিনি তেমন গাননি। কৃষকের গানটি শুরু হয়েছে এভাবে- আয়রে, আয়রে সবে, আয়রে কাটি ধান, কাটি ধান, আয়রে…। গানের আহ্বান- আস সবাই মিলে ধান কাটি।

বাংলাদেশ ধানের দেশ, আবহমান কাল থেকে। আমাদের গ্রামের বাড়িতে হতো কৃষিকাজ। সবাই না, কেউ কেউ নিজের জমিতে ধান চাষ করাতেন। অন্যদের বর্গা লাঙল-গরু ছিল এবং গাভূরও ছিল। কর্ষিত জমিতে ধানবীজ ছড়িয়ে দিয়ে কিংবা বীজ ধান রোপণ করে চাষ হতো। ধান পাকলে চাষীরা ভারে ভারে, কিংবা দূরবর্তী জমি হলে গরুর গাড়িতে ধান আনত বাড়িতে। উঠোন ভরে যেত ধানের রাশি রাশি গোছায়। জোয়াল বাঁধা গরু দিয়ে ধান মাড়ানো হতো। আছাড় দিয়ে পা দিয়েও মাড়ান হতো। মাড়ানোর পর উঠোনে ধান শুকোতে দেয়া, পানিতে ভেজানো সেদ্ধ করা, আবার শুকানো। সব বাড়িতে ধানের গন্ধ, অসিদ্ধ (আতপ) সিদ্ধ দুই ধানের গন্ধ আলাদা। সেই গন্ধ কেবল স্মৃতিতেই আছে, হাতড়ে বেড়াই শুধু।

উঠোনের প্রাঙ্গণে পথে-ঘাটে চলাফেরার রাস্তায় সব জায়গাতেই খড় পড়ে থাকে। কৃষকের বাড়ির উঠোনের এক কোণে কিংবা পুকুর পাড়ে মাড়ানো শুকনো খড়গুলো স্তূপাকৃতি উঁচু হতে থাকতো গরুর খাদ্য হিসেবে। সম্পন্ন কৃষকের বাড়িতে এ ঊর্ধ্বমুখী স্তূপগুলো ভবনের বা মসজিদের গম্বুজের রূপ নেয়। কোনো কোনোটি এতই বড়, এতই উঁচু হয়ে যেত যে তা আমাদের বিস্ময় সৃষ্টি করত। ধান কাটা হয়ে গেলে আমরা কিশোরেরা ভোর সকালে চলে যেতাম ফসলবিহীন মাঠে। তখনও পড়ে আছে এখানে-ওখানে একটা দুটা ধানের গোছা। বাড়িতে নিয়ে আসার সময় চাষীর ধানের ভার থেকেও দু’একটা গোছা খসে যেত। এগুলো সংগ্রহ করতে আমাদের আনন্দ ছিল বেজায়। সংগৃহীত ধানের ছড়াগুলো এক আঁটির মতো হতে হতে ভোরের শিশির কেটে যেত সূর্যালোতে আস্তে আস্তে। বাড়িতে ফিরে এসে দেখি দহলিজে মোয়া-দাদা হাসি মুখ।

দাও আঁটিটি, আর এই নাও মোয়া। গুড় দিয়ে তৈরি টাটকা মোয়া, স্বাদে গন্ধে ভরপুর। একটা মুখে দিয়ে বাকিগুলো নিয়ে যেতাম মায়ের কাছে। কী যে খুশি হতেন মা! কোথায় ছেলের হাতে মোয়া দেবেন মা, উল্টো মায়ের হাতে মোয়া দিচ্ছে ছেলে।

শুধু মোয়া তো নয়। মুড়ি-মুড়কি খই চিড়ে নানা রকমের পিঠে-পায়েশ-ফিরনি, সেমাই, পিঠা নাড়ু, চালভাজা কত কী! ধান চাল থেকেই তো সব তৈরি হয়। ঢেঁকিতে পা পড়ে গৃহস্থ বাড়ির মেয়েদের, বুয়াদের। ধুপ্ ধুপ্ অনবরত, ক্লান্তিবিহীন। কত রকমের ধান- ঋতু অনুযায়ী, আউশ, আমন, বোরো। আগে ছিল আউশ আর আমন। আউশ বর্ষার ধান, শাওনের; আমন শুকনো দিনের, হেমন্তের-শীতের। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন দুটি ফসলই হতো। আউশ আর আমন, বোরোও হতো জলাভূমিতে, হাওর অঞ্চলে। আমনই বাংলার প্রধান ধান ফসল। বাংলার নবান্ন উৎসব এ আমনের সঙ্গেই যুক্ত। নাড়ু-মুড়ি-মুড়কি-পিঠে পায়েশ তো আছেই, প্রধান উৎসব নব অন্ন গ্রহণ- পোলাও-কোর্মা রোস্ট-কাবাব নয়, ধোঁয়া ওঠা ভাতের সঙ্গে পুকুরের খাল-বিলের মাছ ঘরে পালা হাঁস-মুরগি, ডাল, দুধ, দই, গুড় এগুলোই হল নবান্নের গ্রামীণ খাবার। নবান্ন এখন নগরে চলে এসেছে এবং নানা নাগরিক উপাচারে উৎকট হয়ে গেছে।

মিডিয়া টেলিভিশনের কল্যাণে এ উৎসব বেজায় কৃত্রিম ও রঙিন হয়ে উঠেছে। নবান্ন শুধু আমনে হয়, তা নয়, আউশের ফসল তোলার পরে গ্রামের কৃষকের ঘরে এবং গৃহস্থ বাড়িতে ঘটা করে না হলেও, ছোটখাটো আকারে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আউশ চাষ এখন বাংলাদেশ থেকে উঠে যাচ্ছে। তার জায়গা দখল করে নিয়েছে ইরি। ফিলিপাইনের ধান গবেষণার কল্যাণে বাংলাদেশে ইরি নামে উচ্চ ফলনশীল ধান যার ভারতে স্বাদ অনেকটা কম এবং অন্যান্য নামের ধান এখন বাংলাদেশের প্রধান উৎপাদন। বসন্তের শেষে গ্রীষ্মের শুরুতে খটখটে উষ্ণ আবহাওয়ায় এ-ধান কৃষকের ঘরে আসে। পরপরই আসে বোরো ধানের সংবাদ। এ ধানেরও প্রচুর ফলন। বিপদকালে (এবারের করোনা যেমন) পাকা ধান কাটার লোক পাওয়া যায় না। কিন্তু তাই বলে, স্কুল-কলেজের ছাত্রদের ধান কাটার জন্য নির্দেশ দান মোটেও সমীচীন নয়। এদের কেউ কেউ যে ধান কাটেনি তা নয়; কিন্তু কর্তা ব্যক্তিরা যাদের পূর্ব পুরুষরা ধান কেটেছে, করোনায় নিজেদের নিরাপদে রেখে অল্প বয়সীদের কেন ধান কাটতে লাগিয়ে দিল সে প্রশ্ন থাকে। বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে অনেক বেকার যুবক। তাদের লাগানো ধান কাটা দলীয় কোনো উৎসব নয় এবং টেলিভিশনের প্রদর্শনীও নয়। কড়া রোদে বিস্তীর্ণ ফসলক্ষেতে কিংবা হাওরে পাকা ধান কাটতে যথেষ্ট ঘাম ঝরাতে হয় এবং প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। কৃষককুলকে বীজ বপন থেকে আরম্ভ করে পাকা অবস্থায় আনা পর্যন্ত উদয়াস্ত কী পরিশ্রমটাই না করতে হয় তা চাষীরাই জানেন। আর এটাও সত্য, উৎপাদনের দীর্ঘ কাজ ও আয়োজনের চেয়ে পাকা ফসল কাটা যথেষ্ট সহজ।

ধান গাছে তক্তা হয় কিনা- এ রকম প্রশ্ন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ উত্থাপন করেছিলেন তার ‘পল্লী সাহিত্য’ নামের প্রবন্ধে। প্রবন্ধটির মূল কথা গ্রামে ফিরে যাও, আর পল্লীর সাহিত্য-সংস্কৃতির খোঁজ নাও। শুধু শহরে বসে অনিকেত হয়ে থাকলে দেশের নাড়ির সঙ্গে কোনো যোগ থাকবে না। কিন্তু নাগরিক জীবনে শিক্ষার্থীরা, হয়তো তাদের বাবা-মারাও ঘেরাটোপে এতটাই আবদ্ধ যে তারা ধান গাছে উত্তম তক্তা হাওয়ার কথা ভাবলেও ভাবতে পারেন।

এরকম বিপদে আমিও পড়েছিলাম। প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর আগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স শ্রেণিতে আমি পড়াচ্ছিলাম। সেদিন কী কারণে সাধারণ ছাত্ররা ধর্মঘট ডেকেছিল। মনে হল শিথিল ধর্মঘট। সাধারণত শ’খানেক ছাত্র-ছাত্রী ক্লাসে উপস্থিত থাকে। সেদিন পেলাম ত্রিশ পঁয়ত্রিশ জন, অধিকাংশই ছাত্রী, সুবেশা; অল্প সংখ্যক ছাত্র, সুবেশ। পড়ানোর এক ফাঁকে ধানের প্রসঙ্গ এলো। আমার তখন ডক্টর শহীদুল্লাহ কথা মনে পড়ল। আমি ছাত্র-ছাত্রীদের বললাম, তোমরা নিশ্চয়ই ধান দেখেছ। ওরা চুপ করে আছে দেখে খটকা লাগল; পুনরায় জানতে চাইলাম। ওরা যা বলল তাতে আমি স্তম্ভিত; একটা ছেলেমেয়েও ধান দেখেনি, ধান গাছও দেখেনি। এটা অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়। এরা সম্ভবত ঢাকার বাইরে যায়নি, আর গেলেও চোখ মেলে খোলা মাঠে তাকায়নি।

তাকালেও চেনার বা জানার চেষ্টা করেনি। বৃত্তান্ত জেনে বুঝলাম, এরা ঢাকা শহরের সম্পন্ন ঘরের ছেলেমেয়ে। এদের বাংলা পড়ার কারোই ইচ্ছা ছিল না। এরা পড়ছে বাধ্য হয়ে। সুতরাং চুলোয় যাক ধান আর ধান গাছ। গাছ যখন, তখন ধানগাছও চিরলে নিশ্চয়ই তক্তা হবে। তবে তক্তা যে গাছ চিরলে হয় সে জ্ঞানও তাদের আছে কিনা সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এরা যে প্রতিদিন অল্প-স্বল্প ভাত খায় এবং সে ভাত যে চাল থেকে হয় এবং চালের উৎস যে ধান তা এদের মাথায় হাতুড়ির আঘাতে শেখানোর প্রয়োজন রয়েছে।

ধানের কত নাম, সরু-মোটা কত নামের চাল। নানা রকম শালি ধান- এই শালি সেই শালি। শুভ্র উজ্জ্বল সাদা চাল, লাল চাল, বাদামি চাল, কালচে চাল। সুগন্ধে আমোদিত চালগুলো পোলাও রাঁধার কত বিচিত্র চাল বাসমতী, বাঁশফুল, সরু সরু চিকন চিকন নানা ভোগ নামের চাল, চিনির মতো সূক্ষ্ম চাল। তবে বাংলার সাধারণ মানুষ মোটা চালের ভাত খেয়েই বেঁচে আছে- শ্রমজীবী, স্বল্পআয়, দরিদ্র মানুষ। তার মধ্যে হঠাৎ বিলাস-বিনি ভাত, বিন্নি ধানের খই। কখনও কখনও ক্ষুদ্র সরষে দানার মতো কাউন চাল। বাংলার ধান চাল নিয়ে লোক সাহিত্য বিশেষজ্ঞ আশরাফ সিদ্দিকীর এমন একটি কবিতা আছে যেখানে কোনো ‘আলাদা শব্দ’ নেই, কেবল আছে বাংলাদেশের ধানগুলোর নাম- চল্লিশ পঞ্চাশটা তো হবেই। বাংলার সব কবি কৃষিজীবন ও ধান নিয়ে কবিতা লিখেছেন। কঙ্গটিনা পাকেলা রে/সবর সবরী মাতেলা। ওই সুগন্ধি কাউন ধান, এর সূক্ষ্ম চাল থেকে কারণ বাড়িও হয়, যেমন হয় ধান থেকে, ধেনো। মধ্যযুগের বাংলা কাব্যগুলোতে যেখানে যেখানে কৃষিজীবন আছে, সেখানে সেখানে ধান থাকবেই, চণ্ডীমঙ্গলে, অন্নদা মঙ্গলে, শিবায়নে এবং লোক সাহিত্যে তো বটেই, তৈমনসিং গীতিকায়, পূর্ব বঙ্গের গাথায়। দেওয়ানই মদীনার গৃহস্থ জীবনে কৃষিকাজ-প্রসঙ্গ তো স্মরণীয়। মদীনার দুঃখের বৃত্তান্তের সঙ্গে ধান ও কৃষিকাজ জড়িয়ে আছে।

ডিএল রায় তার অমর গানে ধন-ধান্যের কথা বলেছেন। ‘এমন ধানের উপর ঢেউ খেলে যায়, বাতাস কাহার দেশে।’ আন্দোলিত ধান্য-শীর্ষ যে আবেগ ও শোভা সৃষ্টি করে তা ভাবের কবিদের সম্পদ এটি চিত্ত নয় গতিময় চিত্রকল্প। রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিকতার রঙ সোনা! তিনি যে ‘সোনার বাংলা’ গানটি লিখেছেন তার অনুষঙ্গ পাকা ধান ও প্রকৃতি, রাশি রাশি রোদ। রাশি রাশি ধান দিয়েই তো রবীন্দ্রনাথ কবিতার ‘অনুপ্রাস’ দিয়েছেন- রাশি রাশি ভারা ভারা/ধান কাটা হল সারা। এখানে কবিতার নাম কাব্যের নাম সবই সোনা- ‘সোনার তরী’। এই কবিতাটি কেন উচ্চ মাধ্যমিকে পাঠ্য করা হয়েছে আমি জানি না। ষাটের দশকে যখন আমি এই কবিতা নিয়ে কাজ করছিলাম তখন রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিলাম। রূপক-প্রতীকে ভরা আপাত সরল কবিতাটি খুবই দুরূহ। আর এ কবিতার ব্যাখ্যা নিয়ে রচনার সময় থেকে রবীন্দ্র গবেষকদের মধ্যে নানা বিতর্ক নানা অর্থ। রবীন্দ্রনাথকে সমালোচনা করলে তা ভক্তদের কাছে হয় বিদূষণ। আমি প্রবল রবীন্দ্রানুরাগী হয়েও কখনও সমালোচনাকে বিদূষণ মনে করিনি। ‘সোনার তরী’ কবিতাটি কৃষক আর ধানের প্রসঙ্গ নিয়েই।

স্বর্ণবর্ণ কবি জসমীউদ্দীনকেও মাতিয়েছিল তার সবচেয়ে সুপরিচিত কাব্য ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ কৃষি জীবনের বিয়োগান্ত প্রণয়োপাখ্যান। নতুন চাষা ও চাষিণী রূপাই আর সাজুর নব সংসার ধানে ভরা-

আশ্বিন গেল, কার্তিন মাসে পাকিল খেতের ধান,

সারা মাঠ ভরি গাহিছে কে যেন হলদি-কোটার গান।

ধানে ধনে লাগি বাজিছে বাজনা, গন্ধ উড়িছে বায়,

‘সারা মাঠে ধনে, পথে ঘাটে ধান, উঠানেতে ধান ভরি,

সারা গাঁও ভরি চলেছে কে কবি ধানের কাব্য পড়ি।’

নক্সী কাঁথার মাঠের আদলে ছোট একটা নাটকও লিখেছিলেন জসীমউদ্দীন। এখানেও নায়ক রূপাই। তার আবেগ ওই সোনার ধান নিয়ে-

‘ইস্যিরে দান। এহেবারে ক্ষ্যাতে বইরা সুনার

গয়না ঝকমক করতাছে।’

‘বদ্দর লোকগো কত বাকশ তোরঙ্গ বরা সুনা রূপা। আমাগো সোনারূপা এই দান ক্ষ্যাত।

‘বাংলার প্রকৃতিতে সোনার ধান ঋতুতে ঋতুতে ঝলমল করে ওঠে। জসীমউদ্দীন ধানের গন্ধ অনুভব করেছিলেন এবং শুনেছিলেন ধানের গান, গদ্য ও নূপুর ধ্বনি। জসীমউদ্দীনের কাব্যের নাম ‘ধানক্ষেত’, আলাউদ্দিন আল আজাদের ছোট গল্পের বই ‘ধান কন্যা’ এবং লোকসাহিত্যের গবেষক মুহম্মদ মনসুর উদ্দীনের বই ‘ধানের মঞ্জুরী’। ধান বাংলা কাব্যে বারবার এসেছে। আধুনিকবাদীরা অবশ্য স্বতন্ত্র ঘরানার, কলকাতা ও ঢাকা উভয় নাগরিক বৃত্তে শামসুর রাহমানের কবিতায় ধান নেই। ব্যতিক্রম আল মাহমুদ।

নজরুলগীতির নায়িকা শাওনের অফুরন্ত বর্ষায়েও বর্ষা ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করে দয়িত মিলনের অভাবে। বর্ষা যে মিলনের ঋতু! এ অবস্থায় অভিমানাহত প্রেমিকা মাকে বলছে- আমাকে ধানী রং ঘাঘরি মেঘ রং ওড়না পরতে বোলো না। নজরুল ও জীবনানন্দ সমসাময়িক। নজরুলের ধানী রং শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশকে এমন এক অপূর্ব রস-ভূস্বর্গের স্বাদ দিয়েছিল যেখানে কোথায় হতাশা, কোথায় বিবমিষা, কোথায় ক্লান্তি, কোথায় ক্লেদ, কোথায় শূন্যতা বরং আশ্চর্য এক রূপ লোক বর্ণিল হয়ে ওঠে। ‘নষ্ট শসা’ দিয়ে রূপসী বাংলাকে বোঝা কেবলই মূঢ়তা। ওই যে রূপলোক তা ধানের প্রসঙ্গ অনুষঙ্গ দিয়েই মোড়া। বলা যায়, জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’ ধানেরই কাব্য। ধানসিঁড়ি নদী বাস্তবতার রূপকল্পকেও ছাড়িয়ে যায় ধানেরা সিঁড়ি হয়ে নদীতে মেশে। শুধু ধানসিঁড়ি নয়, জলসিঁড়িও আছে। সেখানে সোনালি ধান, খই ধান, শালি ধান, বাসমতী ধান, বালাম ধান, রূপ শালি ধান, আরও কত ধান। ধানের অনুষঙ্গে আসে ধানী শাড়ি, ধানী শ্যামা পোকা, মৌরীর ধান ধানী শাল, চালধোয়া স্নিগ্ধ হাতে, বাসমতী চালে ভেজা শাদা হাত, নরম ধানের গন্ধ, ক্ষুদের গন্ধ। বাংলার ধান যে রূপশোভা-স্বাদে-গন্ধে ভরা সে কথা ভাবের মানুষ ছাড়া আর কেইবা জানে। ‘ধানের শব্দ ভেসে আসে নিস্তব্ধ নির্জনে। তখনই মনে হয়- একদিন এই দেহ ঘাস থেকে ধানের আঘ্রাণ থেকে এই বাংলায়/ জেগেছিল। রূপসী বাংলা যেন,’

‘কোন এক রাজকন্যা- পরনে ঘাসের শাড়ি- কালো চুলে ধান

বাংলার শালিধান।’

রূপকথার কল্পনার মধ্যে দুর্বোধ্য সুন্দর এক উপমাও ভেসে আসে- ‘সেইখানে লক্ষ্মীপেঁচা ধানের গন্ধের মতো অস্ফুট,’

জীবনানন্দ দাশ রূপরসগন্ধ স্পর্শের কবি। তার কবিতায় বাংলার ধান বিচিত্র অনুভূতিতে কথা উঠে এসেছে।

ওই যে ‘কালো চুলে ধান/বাংলার শালিধান’ এই অসামান্য রূপকল্পটি বাংলার কিষাণির কৃষিজীবনের। রূপান্তরিত বিশ্বে কৃষি এখন যন্ত্রাধীন বটে, কিন্তু কিষান-কিষানির জীবনরূপই হল গ্রামবাংলা। এদের জীবনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেটা হবে না, যদ্দিন না ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়। তারা প্রতি ঋতুতে ধান ফলাচ্ছে। ধান চালের অভাব অর্থাৎ খাদ্যের অভাব তারা ঘটতে দেয় না। সে জন্য দুর্ভিক্ষ নেই দেশে। শাসনচক্র কৃষকের পরিশ্রমের কথা না বলে নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করে, ধানের ন্যায্য দাম না দেয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। কৃষকরা সব সময় নির্যাতিত সেই সামন্ত যুগ থেকে আরম্ভ করে বর্তমান সময়েও। তবু তারা বহমান কাল ধরে ধানের চাষ করে, পাকা ধান কাটে।

ধানের সৌন্দর্য আর যথাযথ শ্রমমূল্য দুই-ই আনন্দের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here